“যখন কোনো কিছু যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়, তখন আপনি তা করবেনই—এমনকি পরিস্থিতি আপনার অনুকূলে না থাকলেও।” — ইলন মাস্ক।
আজকের বিশ্বে ইলন মাস্ক এক বিস্ময়ের নাম। ইলন মাস্কের জীবনকাহিনি মূলত এক জেদি স্বপ্নবাজ, বারবার ব্যর্থতা আর বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের দুনিয়ায় নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার গল্প। স্পেস-এক্স (SpaceX), টেসলা (Tesla) কিংবা এক্স -তার প্রতিটি উদ্যোগই যেন পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার একেকটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এক নিঃসঙ্গ বালকের যাত্রা
১৯৭১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্ম নেওয়া এলন রিভ মাস্ক । ছোটবেলা থেকেই বই আর কম্পিউটারের জগতে নিমগ্ন ছিলেন। বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, মা ডায়েটিশিয়ান ও মডেল। মাত্র ১০ বছর বয়সে নিজের চেষ্টায় কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শেখেন এবং ১২ বছর বয়সে ‘ব্লাস্টার’ (Blastar) নামক একটি ভিডিও গেম বানিয়ে ৫০০ ডলারে বিক্রি করেন।পারিবারিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ থাকলেও বাবা–মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ আর স্কুলজীবনের বুলিং তাঁর শৈশবকে করেছে বন্ধুর ও নিঃসঙ্গ।
শূন্য হাতে আমেরিকা ও প্রথম সাফল্য
মাত্র ১৭ বছর বয়সে পকেটে খুব সামান্য টাকা নিয়ে তিনি কানাডায় চলে যান, পরে পাড়ি জমান আমেরিকায়।১৯৯৫ সালে ভাই কিমবাল মাস্ককে নিয়ে এলন শুরু করেন Zip2, যা মূলত অনলাইন সংবাদপত্রের জন্য ম্যাপ ও ব্যবসায়িক ডিরেক্টরি দেওয়ার এক ধরনের সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম। রাত–দিন কোড লেখা আর অফিসে ঘুমিয়ে থাকা এই দুই ভাইয়ের স্টার্টআপ শুরুতে বিনিয়োগ পেতে হিমশিম খেলেও, ডটকম বুমের সুযোগে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জায়গা করে নেয়।১৯৯৯ সালে ৩০৭ মিলিয়ন ডলারে কোম্পানিটি বিক্রি হওয়ার পর মাস্কের হাতে আসে ২২ মিলিয়ন ডলার।
পেপাল (PayPal) এবং চরম ঝুঁকি
পরবর্তীতে তিনি X.com (যা পরে PayPal হয়) প্রতিষ্ঠা করেন।যা ছিল অনলাইন ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও ই–পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। কিছুদিন পর X.com মিশে যায় Confinity নামের আরেক কোম্পানির সঙ্গে এবং জন্ম নেয় PayPal, যেটি দ্রুতই অনলাইন পেমেন্টের বিশ্বে এক বিপ্লবী সমাধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।তবে ব্যবসার শীর্ষে উঠতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে মাস্ককে CEO পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যা ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বড় ধাক্কা।০০২ সালে eBay যখন PayPal–কে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার ডিলে কিনে নেয়, তখন মাস্কের হাতে আসে প্রায় ১৬৫ মিলিয়ন ডলার।মাস্ক তার সবটুকু টাকা ঢেলে দেন স্পেস-এক্স এবং টেসলা-র পেছনে।
SpaceX ও দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়ানো
২১০০ সালের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে মাস্কের নজর চলে যায় মহাকাশে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন SpaceX। নিজের অর্থ ঢেলে বানাতে শুরু করেন সস্তা ও পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট। ২০০৮ সাল ছিল মাস্কের জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। স্পেস-এক্সের প্রথম তিনটি রকেট উৎক্ষেপণই ব্যর্থ হয়। টেসলা তখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। একদিকে ব্যক্তিগত জীবনে বিচ্ছেদ, অন্যদিকে ব্যবসায়িক ধস—সব মিলিয়ে মাস্ক তখন খাদের কিনারায়। শেষ সম্বলটুকু দিয়ে চতুর্থবার রকেট উৎক্ষেপণের চেষ্টা করেন এবং সেটি সফল হয়। এরপরই নাসা থেকে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি পায় স্পেস-এক্স।
ইলন মাস্কের ‘স্পেস-এক্স’-এর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রজেক্টগুলোর মধ্যে একটি হলো স্টারলিঙ্ক। এটি মূলত পৃথিবীজুড়ে উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার জন্য মহাকাশে স্থাপন করা কয়েক হাজার ছোট স্যাটেলাইটের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক।স্টারলিঙ্ক বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করার এক স্বপ্ন দেখাচ্ছে। আজ টেসলা বৈদ্যুতিক গাড়ির জগতে বিপ্লব এনেছে, আর স্পেস-এক্স মানুষকে মঙ্গল গ্রহে পাঠানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। মাস্ক প্রমাণ করেছেন যে, প্রযুক্তি আর উদ্ভাবনের সঠিক মিশেল দিতে পারলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
ইলন মাস্কের জীবন দেখায়, শূন্য থেকে স্টারশিপ পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে ব্যর্থতাকে শিক্ষক আর ঝুঁকিকে সঙ্গী বানাতে হয়। বারবার দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্ত ঘেঁষেও তিনি SpaceX-এর রকেট বিস্ফোরণ আর Tesla-র সংকট পেরিয়ে বিশ্ব বদলে দিয়েছেন।
স্বপ্ন যথেষ্ট বড়, তখন অসম্ভব শুধুই একটি অস্থায়ী বাধা!
