স্টার্টআপ (Startup) হলো এমন একটি নতুন ব্যবসা বা উদ্যোগ যা কোনো একটি নির্দিষ্ট সমস্যার নতুন বা অভিনব কোনো সমাধানের মাধ্যমে দ্রুত ব্যাবসাকে বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে।
স্টার্টআপের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে – প্রযুক্তি বা ভিন্নধর্মী কোনো পদ্ধতি নিয়ে কাজ কর, খুব দ্রুত বিশাল সংখ্যক মানুষের কাছে নিজেদের সেবা পৌঁছানো, শুরুতেই বড় বিনিয়োগ এবং ঝুঁকি অনেক বেশি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
একটি নতুন স্টার্টআপ শুরু করা যতটা রোমাঞ্চকর, ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জিং। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অধিকাংশ স্টার্টআপ তাদের প্রথম দুই বছরের মধ্যে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার বীজ অনেক সময় বপন করা হয় শুরুর প্রথম ছয় মাসেই।
বাংলাদেশে স্টার্টআপ সংস্কৃতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আজ বেশি প্রাণবন্ত। দেশে তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে, প্রযুক্তি আর পরিকল্পনার যুগে সবাই চায় নিজের উদ্যোগে নতুন কিছু সৃষ্টি করতে। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রথম ছয় মাসই সবচেয়ে সংকটময় সময়। এই সময়ের ভুল সিদ্ধান্তই অনেক সময় একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে থামিয়ে দেয়। চলুন জেনে নিই, শুরুতেই কোন ভুলগুলো একজন উদ্যোক্তার এড়িয়ে চলা উচিত।
১. বাজার যাচাই না করে শুরু করা
অনেক উদ্যোক্তা আইডিয়া নিয়ে এতটাই উৎসাহী থাকেন যে তারা গ্রাহকের বাস্তব চাহিদা যাচাই না করেই কাজ শুরু করেন। বাজার বিশ্লেষণ, প্রতিযোগী গবেষণা, টার্গেট কাস্টমার শনাক্ত করা—এই ধাপগুলো এড়িয়ে গেলে পণ্য নামার পর দেখা যায় কেউ আগ্রহীই নয়।
সমাধান: পণ্য বা সেবা তৈরির আগে টার্গেট কাস্টমারদের সাথে কথা বলুন। তাদের সমস্যাগুলো বুঝুন এবং আপনার আইডিয়া সেটি সমাধান করছে কি না তা নিশ্চিত করুন।
২. অর্থনৈতিক পরিকল্পনা উপেক্ষা করা
প্রথম ছয় মাসে আয় কম, ব্যয় বেশি—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেকেই বাজেট ঠিকমতো না করায় দ্রুত অর্থসংকটে পড়েন।
পরামর্শ: কিছু মূলনীতি হতে পারে—প্রথম দিন থেকেই খরচের হিসাব রাখা, প্রয়োজন ছাড়া কর্মী নিয়োগ না দেওয়া এবং “ব্রেক ইভেন” পয়েন্ট বুঝে পরিকল্পনা তৈরি করা।
৩. অদক্ষ টিম গঠন
ভালো টিম একটি স্টার্টআপের গতি নির্ধারণ করে। অনেক সময় বন্ধু বা পরিচিতজনদের নিয়ে দ্রুত টিম তৈরি করা হয়, কিন্তু দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও লক্ষ্য এক নাও হতে পারে। শুরুতেই পেশাদার ও মানসিকভাবে পরিপক্ব সদস্য বেছে নেওয়া জরুরি।
সতর্কতা: টিমে এমন কাউকে রাখুন যার দৃষ্টিভঙ্গি আপনার সাথে মিলে কিন্তু দক্ষতা ভিন্ন। অর্থাৎ, আপনি যদি টেকনিক্যাল দিকে দক্ষ হন, তবে আপনার এমন একজন পার্টনার প্রয়োজন যিনি মার্কেটিং বা সেলস বোঝেন।
৪. ব্যবহারকারীর পর্যালোচনাকে গুরুত্ব না দেওয়া।
ব্যবহারকারীর পর্যালোচনাকে গুরুত্ব না দেওয়া স্টার্টআপের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি। পণ্য বা সেবা যতোই ভালো হোক, সেটি যদি গ্রাহকের সমস্যা সমাধান না করে, তবে বাজারে টিকে থাকা কঠিন। প্রথম ছয় মাসে নিয়মিত ফিডব্যাক সংগ্রহ ও তার উপর ভিত্তি করে পণ্য বা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনা উচিত।
সঠিক পন্থা: নেতিবাচক ফিডব্যাকই আপনার পণ্যকে নিখুঁত করার সবচেয়ে বড় সুযোগ। গ্রাহকের কথা শুনুন এবং সেই অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তন আনুন।
৫. পণ্য অতিরিক্ত নিখুঁত করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া
অনেক উদ্যোক্তা পণ্যকে অতিরিক্ত নিখুঁত করতে গিয়ে বাজারে নামাতে অযথা দেরি করেন, এতে প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এর চেয়ে সীমিত কিন্তু কার্যকর ফিচার নিয়ে দ্রুত একটি Minimum Viable Product (MVP) বের করা বেশি কৌশলী পদক্ষেপ ।
পরামর্শ: প্রথম দিকেই বাস্তব ব্যবহারকারীর ফিডব্যাক পেলে পণ্যের কোন দিক শক্ত আর কোন অংশ দুর্বল, তা দ্রুত ধরা যায় ।ফলে সময়, অর্থ ও জনবল সাশ্রয় হয় এবং প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্টের সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব হয় ।
৬. নেটওয়ার্কিংয়ের গুরুত্ব না বোঝা
শুরুতে শুধু নিজের কাজেই মনোযোগ দেওয়া ভালো, কিন্তু সংযোগহীনতা ধীরে ধীরে ক্ষতির কারণ হয়। ইনভেস্টর, পরামর্শক, অন্যান্য উদ্যোক্তা — এদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৭. আইনি ও ডকুমেন্টেশনে অবহেলা
ট্রেড লাইসেন্স, ইনকর্পোরেশন, ফাউন্ডারস এগ্রিমেন্ট বা মেধা সম্পত্তির (Intellectual Property) অধিকার—এসব বিষয়ে শুরুর দিকে অবহেলা করলে পরবর্তীতে বড় ধরণের আইনি জটিলতা বা মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।
পরামর্শ: শুরু থেকেই সব চুক্তি লিখিত আকারে রাখুন এবং আইনি প্রক্রিয়াগুলো সেরে নিন।
উপসংহার: স্টার্টআপ যাত্রার শুরুটা যেমন উত্তেজনাপূর্ণ, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও বটে। তবে বুদ্ধিমান উদ্যোক্তা তারাই, যারা অন্যের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের যাত্রাকে নিরাপদ রাখেন। প্রথম ছয় মাসের সিদ্ধান্তগুলোই প্রায়শই নির্ধারণ করে দেয় উদ্যোগটির ভবিষ্যৎ। তাই তাড়াহুড়ো না করে সচেতনভাবে পরিকল্পনা, শেখা ও মানিয়ে চলাই সফলতার চাবিকাঠি।
স্টার্টআপে সফলতা হঠাৎ আসে না, আসে ধারাবাহিকভাবে ভুল থেকে শেখার মাধ্যমে।
